পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা, পিছু হটছে পেন্টাগন?
পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

ইরানের সাথে যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনাদের দীর্ঘদিনের সুরক্ষা ধারণাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটির দুর্বলতা এখন প্রকাশ্যে এসেছে। ইরান দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধবিরতির শর্ত হিসেবে এই অঞ্চল থেকে সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধের বাস্তবতায় ইরান তাগিদ না দিলেও পেন্টাগনকে হয়তো এমনিতেই তাদের ঘাঁটির আকার ছোট করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরিবর্তন

২০২২ সালে সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলে ইয়ানবু শহরের কাছে 'এলএসএ জেনকিন্স' নামে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধের সময় এই ঘাঁটির তৎপরতা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এর মূল কারণ, ইরানের মূল ভূখণ্ডের কাছাকাছি থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে অনবরত ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আঘাত হানছিল।

সৌদি আরবে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষা ও সেনা অ্যাটাশে আব্বাস দাহুক বলেন, ইরানের উপকূলের একদম কাছাকাছি না থেকে, কিছুটা কৌশলগত দূরত্ব বজায় রেখে মার্কিন রণকৌশলকে এগিয়ে নিতেই মূলত এই জেনকিন্স ঘাঁটিটি তৈরি করা হয়েছিল।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্থায়ী ঘাঁটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন ও রাশিয়ার স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সহায়তায় ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যেভাবে নিখুঁতভাবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেছে, তাতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী ঘাঁটিগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে ইরান যে ঘাঁটিগুলো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে চলে যেতে বলছে, ওয়াশিংটন নিজেই হয়তো আর সেগুলোতে ফিরে যেতে আগ্রহী হবে না।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সিআইএ-র সাবেক পরিচালক এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাবেক প্রধান ডেভিড পেট্রাউস গত মে মাসে ব্লুমবার্গকে বলেন, সত্যি বলতে, ইরান যেভাবে এই ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাতে পারে তা দেখার পর, সেখানে আগের মতো অবস্থান ধরে রাখার আগ্রহ আমাদের কমে গেছে। আমি যখন সেন্ট্রাল কমান্ডের দায়িত্বে ছিলাম, পরিস্থিতি এখনকার চেয়ে অনেক ভিন্ন ছিল।

তিনি আরও জানান, বর্তমান সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান আগের কমান্ডারদের মতো যুদ্ধক্ষেত্রের একই টাইম জোনে অবস্থান করছেন না, বরং ফ্লোরিডার টাম্পা থেকেই পুরো যুদ্ধ পরিচালনা করা হচ্ছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধের যুগে ঘাঁটির দুর্বলতা

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যুদ্ধের এই যুগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ও স্থায়ী ঘাঁটিগুলো এখন সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মধ্যে নতুন করে লড়াই শুরু হলে এই দুর্বলতা আবারও সামনে আসে।

মার্কিন হামলার জবাবে ইরান কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালায়। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সব ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি করলেও, 'সোর অ্যাটলাস' নামের প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট চিত্রে কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটির একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত সামরিক শেলটার দেখা গেছে। এ ছাড়া কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একটি টার্মিনালও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরান দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে এই ক্ষতি করেছে।

বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটির বর্তমান অবস্থান কার্যত এখন অরক্ষিত।

বিশাল মার্কিন ঘাঁটির যুগ কি তবে শেষ?

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ সামরিক বিশেষজ্ঞ মার্ক ক্যানসিয়ান বলেন, এই যুদ্ধ স্থায়ী ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সামরিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করছে এবং এখানে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ সামরিক উপস্থিতি হবে 'এলএসএ জেনকিন্স'-এর মতো—ছোট আকারের এবং ইরানের সীমানা থেকে দূরে, যাতে সেগুলো সহজে শত্রুর লক্ষ্যবস্তু হতে না পারে।

বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের চুক্তি রয়েছে। কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে মার্কিন সেনারা স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। ওমানের কোনো মার্কিন ঘাঁটি নেই, তবে তারা মার্কিন বাহিনীকে বন্দর ও আকাশপথ ব্যবহারের সুবিধা দেয়। চলমান যুদ্ধে ওমানে সবচেয়ে কম হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে সৌদি আরবে বর্তমানে মাত্র ২ হাজার ৭০০ মার্কিন সেনা রয়েছে, যা দুই দশক আগের তুলনায় অর্ধেক। ২০০৩ সালেই সৌদি আরব স্থায়ী ঘাঁটির বদলে চুক্তিভিত্তিক সুবিধা ও যৌথ প্রশিক্ষণের মডেলে চলে যায়।

সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে ওমানের মতো 'হালকা উপস্থিতি' ও কৌশলগত সুবিধার নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য করবে।

ঘাঁটিগুলো কি সুরক্ষিত করা সম্ভব?

মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে কুয়েতেই সবচেয়ে বেশি—প্রায় ১৪ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। সেখানকার দুটি বড় ঘাঁটি 'ক্যাম্প আরিফজান' এবং 'আলি আল-সালেম বিমান ঘাঁটি' ইরানের তীব্র হামলার শিকার হয়েছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কুয়েত ইরান ও ইরাকি মিলিশিয়াদের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্রের খুব কাছাকাছি। সম্পদ রক্ষার চেয়ে মার্কিন বাহিনী অনেক ক্ষেত্রে সেখান থেকে পিছু হটেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকেই দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষা ইন্টারসেপ্টরের (ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংসকারী ব্যবস্থা) মজুত ফুরিয়ে আসছে।

ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এখন মাত্র ২০০টি 'থাড' ইন্টারসেপ্টর অবশিষ্ট আছে।

সাবেক সেনা অ্যাটাশে দাহুক বলেন, সব ঘাঁটি রক্ষা করতে গেলে ইন্টারসেপ্টর কম পড়বে। তাই সুরক্ষার চেষ্টা করে জীবন ঝুঁকিতে ফেলার চেয়ে আমরা সেনা সরিয়ে নেওয়াকেই বেছে নিয়েছি।

কুয়েতে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডগলাস সিলিম্যান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি এখানে অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে ঘাঁটিগুলোর সুরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করতে হবে।

এদিকে, যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইরান মার্কিন বাহিনীকে উপসাগরীয় উপকূল থেকে দূরে সরে যেতে বাধ্য করেছে। রিয়াদের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরান উপর্যুপরি হামলা চালানোর পর, গত মার্চে মার্কিন বাহিনী সৌদি আরবের তায়েফ বিমান ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।

বর্তমানে বাহরাইনে মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতারে সেন্ট্রাল কমান্ডের সদর দপ্তর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি রয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনী দুবাইয়ের জেবেল আলি বন্দর ব্যবহার করে থাকে। তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণের কারণে এই নৌপথ এখন মার্কিন যুদ্ধজাহাজের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারস্য উপসাগর দিয়ে যাতায়াত না করে লোহিত সাগরের জিজান বন্দর ব্যবহার করার যে প্রস্তাব সৌদি আরব ২০১৫ সালে দিয়েছিল, জেবেল আলি বন্দরের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন সেই বিকল্পটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।

সূত্র: মিডেল ইস্ট আই