এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: তাড়াহুড়োয় ফ্রি ট্রেড চুক্তির ঝুঁকি
এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন: তাড়াহুড়োয় এফটিএর ঝুঁকি

বাংলাদেশ বছরখানেকের মধ্যেই এলডিসি থেকে বেরোতে প্রস্তুত বলে দাবি করা হচ্ছে। 'আমরা আর কত কাল মিসকিন থাকব'—এমন হাহুতাশ চলছে। গ্র্যাজুয়েশনের পর তৈরি পোশাকের বাজার হারাবে বাংলাদেশ, তাই গার্মেন্টসের বাজার নিশ্চিত করতে পাঁচটি দুর্ধর্ষ অর্থনীতির সঙ্গে ফ্রি ট্রেড চুক্তি (এফটিএ) হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের পর এখন দক্ষিণ কোরিয়া, আরব আমিরাত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও এফটিএ করার তোড়জোড় চলছে। সব যেন বন্ধুত্বপূর্ণ চুক্তি—যেন ওরা শর্তবিহীন আমাদের গার্মেন্টস নেবে, বিনিময়ে বোয়িং ও মিসাইল পানির দরে দেবে! কিন্তু বড়দের সঙ্গে ছোটদের ফ্রি ট্রেড চুক্তি কার লাভ, কার ক্ষতি?

বড় অর্থনীতির সঙ্গে এফটিএ: আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা

ভারত তার প্রথম ফ্রি ট্রেড চুক্তিগুলো করেছিল সমকক্ষ অর্থনীতির সঙ্গে—শ্রীলঙ্কা, নেপাল, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর। দর-কষাকষির সক্ষমতা না থাকায় সুপারপাওয়ারের সঙ্গে চুক্তির ঝুঁকি নেয়নি ভারত, এমনকি 'ডেভেলপিং' হওয়ার ৩০ বছর পরেও আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি করেনি (ঝুলিয়ে রেখেছে), ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তি করেছে মাত্র সেদিন। পাকিস্তান 'ডেভেলপিং' হয়েও প্রথম বাণিজ্যচুক্তি করেছিল শ্রীলঙ্কার সঙ্গে (সম্প্রতি করেছে উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান আর চিলির সঙ্গে)। কিন্তু মার খেয়েছে চীনের মতো বড় অর্থনীতির সঙ্গে চুক্তি করে (টেক্সটাইল খাতে চার-পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান নষ্ট হয়েছে)। পাকিস্তান বা চীন এখন পর্যন্ত আমেরিকা বা ইইউর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ এফটিএ করার ঝুঁকি নেয়নি। এশিয়ার 'ডেভেলপিং' দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র ভিয়েতনাম এফটিএ করেছিল আমেরিকার সঙ্গে, কিন্তু ভিয়েতনামের প্রেক্ষাপট আলাদা—পূর্ব এশিয়ায় চীনের বিস্তার ঠেকাতে ভিয়েতনামকে হাতে রাখা আমেরিকার দরকার ছিল, ২৫ বছর আগের চুক্তিটি ছিল মূলত চীনবিরোধী ব্লকের ভূরাজনৈতিক কৌশল।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ভারত, পাকিস্তান বা চীন ডেভেলপিং হয়েও 'ডেভেলপড' অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে এফটিএ করার ঝুঁকি নেয়নি কেন? নিজ দেশের কৃষি ও শিল্পকে পশ্চিমের ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্যের সামনে ছুড়ে ফেলেনি কেন? অথচ আমরা এলডিসি থেকে বেরোনোর আগেই লম্ফ দিয়ে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ এফটিএ করে ফেললাম? শুধু ডেইরি-পোলট্রি-চাল-ডাল তো নয়, সার্ভিস, মেধাস্বত্ব, ই-কমার্স, কাস্টমস, এলএনজি আমদানি, সরকারি প্রকিউরমেন্ট, বিচারিক ম্যানেজমেন্ট, বোয়িং, মিসাইল—সব মিলিয়ে ১৩০ পৃষ্ঠার আদেশ-নির্দেশসংবলিত চ্যাপ্টার আর কোন দেশের চুক্তিতে আছে? নাম 'বাণিজ্যচুক্তি', অথচ 'ডিফেন্স' আর 'ডিজিটাল ডেটা'য় প্রবেশাধিকার দিতে হবে কেন?

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ধনীর জন্য 'প্রটেকশনিজম', গরিবের জন্য বাধ্যতামূলক প্রতিযোগিতা?

বাজার অর্থনীতিবিদদের ক্লাসিক যুক্তি হলো, ধাক্কা না দিলে স্থানীয় শিল্প বিকশিত হয় না। অথচ ধাক্কা দিয়ে প্রতিযোগিতা শেখানোর এই দ্বিচারী দর্শন পশ্চিমের কোন দেশ, কবে, কখন মেনেছে? ইউরোপ-আমেরিকা মেনেছে? সিঙ্গাপুর-মালয়েশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া বা ভারতের শিল্পায়নের ইতিহাস কী বলে? ইউরোপের শিল্পবিপ্লবের পেছনে আছে ২০০ বছরের উপনিবেশের ইতিহাস—বিনা মূল্যে আফ্রিকার ৪০ লাখ দাস, আর ভারতের সস্তা তুলা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপে দ্রুত শিল্পায়নের পেছনে ছিল আমেরিকার মার্শাল প্ল্যান (১৩ বিলিয়ন ডলার)। উনিশ শতকে আমেরিকার শিল্পায়নের শক্ত ভিত গড়েছে অন্তত ১০টি 'প্রটেকশনিস্ট' আইন (ম্যাকিনলি, মরিল, ডিংলি বা উইলসনের শুল্ক আইন ইউরোপীয় পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিয়েছে)। ২০ শতকের আমেরিকা নিজেদের ম্যানুফ্যাকচারিং ও অটোমোবাইলশিল্পে বিলিয়ন ডলারের ভর্তুকি দিয়েছে, 'রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট'-এ ক্রমাগত তহবিল ঢেলেছে।

ভারতের ভারী শিল্পায়নের পেছনে ছিল নেহরুর রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার দূরদৃষ্টি, ৪০ বছরের প্রটেকশনিস্ট নীতি, রাষ্ট্রীয় স্টিল মিল ও রেল ইঞ্জিনের শক্ত ভিত। চীনের 'ক্যাপিটালিজম' দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় বাজেটে। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া বা মালয়েশিয়ার অর্থনীতির ভিত্তি গড়েছে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন। ধনী দেশের সঙ্গে ফ্রি ট্রেড 'খেলা'র আগে স্থানীয় শিল্প সুরক্ষা (প্রটেকশনিজম) পেয়েছে, গবেষণা তহবিল পেয়েছে, প্রযুক্তি পেয়েছে।

আমরা এক গার্মেন্টস নিয়ে বসে আছি ৪০ বছর। কৃষিকে 'লস-মেকিং' করেছি, পোলট্রি/ডেইরিকে সিন্ডিকেটের হাতে ছেড়ে দিয়েছি, একটা ওষুধশিল্প দাঁড়িয়েছিল, সেটাকে মেধাস্বত্ব আইনের জটিল মারপ্যাঁচে ঠেলে দিচ্ছি। ইন্ডাস্ট্রি দাঁড় করানোর বদলে পরিকল্পিতভাবে 'ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন' করা হয়েছে। এলডিসি হিসেবে যত বাণিজ্যসুবিধা পাই, তা স্বেচ্ছায় কোরবানি দিয়ে, এক ঝাঁপে দুর্ধর্ষ 'ডেভেলপড' অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে এখন আমরা 'প্রটেকশন' ছাড়া 'ফ্রি ট্রেড' খেলব? চীন, ভারত বা পাকিস্তান ৩০ বছরে যা করেনি, আমরা তা-ই করব? পাঁচ কোটি হতদরিদ্র মানুষ আর বিশ্বের অন্যতম অপুষ্টি আক্রান্ত শিশুর দেশ হয়ে পেটেন্ট আইনকে 'ওয়েলকাম' করে ওষুধের দাম বাড়ানোর বিলাসিতা আছে আমাদের? অরক্ষিত কৃষি খাতকে পশ্চিমের ভর্তুকিপ্রাপ্ত কৃষিপণ্যের সামনে ছুড়ে ফেলার বাস্তবতা আছে?

শর্ত পূরণের মিথ ও গ্র্যাজুয়েশনের উন্মাদনা

তিনটি শর্ত পূরণ করলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে 'মধ্য আয়ে' গ্র্যাজুয়েশন হয়—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও 'শক' সইবার সক্ষমতা। কিন্তু শর্ত পূরণ মানেই কি একলাফে গ্র্যাজুয়েশন? গ্র্যাজুয়েশনের পর শক্তিশালী দেশগুলোর মাতব্বরি মোকাবিলার সক্ষমতা নাই, অথচ 'মিসকিন' না 'মধ্য আয়'—এসব নামকাওয়াস্তে টাইটেল দিয়ে কি কর্মসংস্থান বাঁচবে, না মুমূর্ষু শিল্পগুলো জ্যান্ত হবে? বারবার বলা হচ্ছে, সময় নাই, দ্রুত গ্র্যাজুয়েশন করো। কারা বলেছে এটা? ইউএনডিপি, না ডব্লিউটিও? খেয়াল করুন, আন্তর্জাতিক কোনো ফোরাম কিন্তু চাপ দিচ্ছে না। বরং তাড়াহুড়াটা সরকারযন্ত্রের ভেতরে। তাতে বহু বছর ধরে ফুয়েল জুগিয়েছে পশ্চিমা ফান্ডে চলা 'মুক্তবাজার' অর্থনীতিবিদেরা।

গ্র্যাজুয়েশন করলে জরুরি বাণিজ্যসুবিধাগুলো হারাবে বাংলাদেশ। পোশাক রপ্তানি করতে আমেরিকা-ইউরোপের শুল্কমুক্ত 'এন্ট্রি' হারাবে। কঠোর মেধাস্বত্ব আইনের কারণে ওষুধের কাঁচামাল আমদানিতে পেটেন্ট ফি দিতে হবে। স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া যাবে না, ঋণ মওকুফের সুযোগ থাকবে না, বৈদেশিক সুদের (ডেট সার্ভিসিং) পরিমাণ বাড়বে। অর্থাৎ গ্র্যাজুয়েশন করলে বিদেশি বিনিয়োগ আসবে কি না সেই গ্যারান্টি নেই, কিন্তু সুদের টাকা অধিক হারে ঠিকই বেরিয়ে যাবে।

'মধ্য আয়ে' গ্র্যাজুয়েশন করলেই বাংলাদেশ যেন একলাফে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্পায়নে ভারত, চীন, সিঙ্গাপুরের কাতারে পৌঁছে যাবে! নতুন করে দরিদ্র হওয়া ১৪ লাখ মানুষ 'হাই জাম্প' দিয়ে দারিদ্র্য লাইনের অপর প্রান্তে ল্যান্ড করবে? মধ্য আয়ের বোতাম টিপবে আর ভিয়েতনামের বিনিয়োগকারীরা সুড়সুড় করে ঢাকায় এসে হাজির হবে!

অন্য এলডিসিগুলো কিন্তু ক্রাইটেরিয়া পূরণ করেই গ্র্যাজুয়েশনের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েনি। মালদ্বীপ, অ্যাঙ্গোলা, ভানুয়াতু বা কিরিবাতি শর্ত পূরণের পর ১০-২০ বছর সময় নিয়েছে! আন্তর্জাতিক ফোরামে বরং গ্র্যাজুয়েশন ঠেকিয়ে রাখাটাই স্বাভাবিক চর্চা। লাফালাফি করাটাই অস্বাভাবিক, যেটা আওয়ামী সরকার করে গেছে।

আমাদের শিক্ষার হার ও গড় আয়ুর ধারাবাহিক উন্নয়ন ঘটেছে। কিন্তু হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্স (এইচডিআই) কি পুরো গল্পটা বলে? এইচডিআই কি ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা, অপুষ্টি, আর খর্বকায় শিশুর হিসাব দেখায়? ভুয়া পাসের হার, মাধ্যমিক লেভেলে ব্যাপক ড্রপ-আউট, শিক্ষকদের দুরবস্থা কিংবা বাল্যবিবাহে শীর্ষে থাকার গল্পটা বলে? কিরিবাতির সঙ্গে এক তালিকায় থাকলে আমাদের মানসম্মান থাকছে না, কিন্তু ওদিকে কঙ্গো, সুদান, আফগানিস্তানের সঙ্গে বিশ্বের টপ টেন ক্ষুধার্ত মানুষের তালিকায় (২০২৬) বাংলাদেশের নামটা জ্বলজ্বল করছে না?

ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (২০২৪) বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত বাংলাদেশের গড় জিডিপি ৭ পার্সেন্ট দেখানো হলেও, আসল জিডিপি ছিল ৪ পার্সেন্ট। সিপিডি (২০২৪) বলছে, আওয়ামী আমলে মাথাপিছু আয় অন্তত ৫০০ ডলার বেশি দেখানো হয়েছে। বাস্তবতা হলো, দেড় দশকের 'জবলেস গ্রোথ', রেকর্ড ভাঙা টাকা পাচার আর শিক্ষা-স্বাস্থ্যের ভগ্নদশার ওপর দাঁড়িয়েই ভুলভাল ডেটা দিয়ে উন্নয়নের রূপকথা সাজিয়েছিল আওয়ামী সরকার।

আরও পড়ুন: মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: বাংলাদেশের ওষুধশিল্পের সামনে অশনিসংকেত (২২ এপ্রিল ২০২৬); আমাদের অরক্ষিত প্রাণবৈচিত্র্য বনাম অসম বাণিজ্যচুক্তি (২২ মে ২০২৬); যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন চুক্তি করার মতো দেশ খুঁজে পাওয়া কঠিন (২৬ মে ২০২৬)।

তবে জিডিপি, মাথাপিছু আয়—এগুলো শুধু অর্থনীতিবিদদের লাগে। কর্মহীন, পুষ্টিহীন, খর্বকায় জনপদ সাদাচোখেই অর্থনীতির বিপন্নতা দেখতে পায়। এক দশকে কৃষি ও কারখানা থেকে ছিটকে পড়েছে লাখো মানুষ, একেকটা ঝড়-বন্যার পর ঋণগ্রস্ত কৃষক গ্রাম ছেড়ে পালাচ্ছে। কলকারখানায় গ্যাস নেই, এলএনজি আমদানির চক্রে দেউলিয়া অবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি হয়েছে মাত্র কয়েক পার্সেন্ট, মেগা প্রকল্পের রেখে যাওয়া ঋণ, অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলোর ভয়াবহ অবস্থা—বিদেশি বিনিয়োগ তো দূরে থাক, লোকাল বিনিয়োগকারীরাই নিরন্তর সংগ্রাম করে টিকতে পারছে না।

এরই মধ্যে ১৯ কোটি মানুষের অভূতপূর্ব জনসংখ্যা নিয়ে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন করে লোকাল উৎপাদনকে ঝুঁকিতে ফেলার এই কাণ্ডজ্ঞানহীন প্রকল্পটির স্বাভাবিকায়ন করা হয়েছে। এরপর আবার অন্তর্বর্তী সরকার এসে বিপর্যস্ত অর্থনীতি নিয়েই বিশ্বের ধনীতম দেশগুলোর সঙ্গে এফটিএ করার নজিরবিহীন তোড়জোড় চালিয়েছে। এখন আবার বিএনপি এসে 'কী যেন একটা ডিলে'র বিনিময়ে আওয়ামী-অন্তর্বর্তী ধারাবাহিকতাটাই রক্ষা করে চলেছে!

দ্রুত গ্র্যাজুয়েশন করলে লাভটা কী? (মান-ইজ্জতের ব্যাপারটি ছাড়া)

কোভিডের পরপর ইউএনসিটিএডি সতর্ক করেছিল—গরিব দেশগুলো মারাত্মক অর্থনৈতিক দুর্যোগে পড়তে যাচ্ছে, নতুন করে হতদরিদ্র হবে তিন কোটি মানুষ—এই বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে এলডিসি দেশগুলোকে বারবার 'এক্সটেনশন' চাইতে হবে না। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলো নিজেরাই এলডিসিভুক্তদের গ্র্যাজুয়েশনের ঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত। তারাই বলছে, সময় নাও, ঝুঁকি আছে।

যুদ্ধ থামেনি, তেলের ব্যারেল ৯৫ ডলার, দুনিয়াজুড়েই উৎপাদনসংকট। গ্র্যাজুয়েশন থেকে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরে আসার জন্য এই দুর্যোগগুলোই যথেষ্ট। আর নিজেদের লেজেগোবরে অর্থনীতি, রিজার্ভ সংকট, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিপর্যয় তো আছেই।

উল্লেখ্য, এলডিসিভুক্ত হলে বহুবার এক্সটেনশন চাওয়া এবং পাওয়াটাও আন্তর্জাতিক ফোরামের খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। ট্রিপসের ৬৬ অনুচ্ছেদেও বলা হয়েছে, মেধাস্বত্ব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এলডিসি দেশগুলো ২০৩৪ পর্যন্ত সময় নিতে পারবে। এত লম্বা ছুটি পেয়ে বাকিরা ধীরগতিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে, অথচ বাংলাদেশ করছে ঠিক উল্টোটা। কৃষি, ইন্ডাস্ট্রি, লোকাল উৎপাদন টিকবে কি না সেই প্রস্তুতি নেই, অথচ ভুলভাল 'ফিল-গুড' পরিসংখ্যানের ওপর দাঁড়িয়ে শীর্ষ জলবায়ু বিপর্যয় আর কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশ 'মধ্য আয়ে'র টাইটেল গলায় ঝুলিয়ে ঠিক কোন জিনিসটা অর্জন করবে? 'মান-ইজ্জত' আর 'বিনিয়োগের বন্যা'?

গ্র্যাজুয়েশন করলেই বাংলাদেশ যেন একলাফে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও শিল্পায়নে ভারত, চীন, সিঙ্গাপুরের কাতারে পৌঁছে যাবে! নতুন করে দরিদ্র হওয়া ১৪ লাখ মানুষ 'হাই জাম্প' দিয়ে দারিদ্র্য লাইনের অপর প্রান্তে ল্যান্ড করবে? মধ্য আয়ের বোতাম টিপবে আর ভিয়েতনামের বিনিয়োগকারীরা সুড়সুড় করে ঢাকায় এসে হাজির হবে!

বিনিয়োগ কি গ্র্যাজুয়েশন দেখে আসে?

বিশ্বব্যাংকের 'ইজ অব ডুইং বিজনেস' জরিপটি দেখুন। বিজনেসরেডি জরিপ, বিবিএক্স বা ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্টটিও দেখুন। সবগুলো জরিপেই বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সটিও (২০২৫) দেখুন। ১৩৯ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬! ভিয়েতনাম ৪৪! বিনিয়োগকারী গ্র্যাজুয়েশনের ট্রফি দেখে আসে না। 'স্মার্ট প্রেজেন্টেশন' দেখেও আসে না। বিনিয়োগ আসে গ্যাস, বিদ্যুৎ আর গভর্ন্যান্স দেখে। সরকারি সার্ভিস, আইনের শাসন, বিচারিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের স্কোর তলানিতে, লোকাল বিনিয়োগকারীরাই ব্যবসা টেকাতে পারছে না, এমন প্রতিকূল পরিবেশে গ্র্যাজুয়েশন বা এফটিএ—যাই করি না কেন, বিনিয়োগের প্লাবন বইবে? বিদেশি বিনিয়োগকারী কি চ্যারিটি করতে আসে?

গ্র্যাজুয়েশন হলেই গ্যাস-বিদ্যুতের সমস্যা মিটে যাবে? ধনী দেশগুলোর অবিশ্বাস্য ভর্তুকির উৎপাদন সামলাতে পারবে আমাদের ছোট-মাঝারি শিল্পগুলো? এমনিতেই উত্তর-দক্ষিণের শিল্পনগরীগুলো এখন 'ডেড'। কোথায় হারিয়ে গেল এক লাখ পাটকল চিনিকল শ্রমিক? হকার, অটোরিকশাচালক বা ছুটা বুয়ার সংখ্যা হু হু করে বাড়ল কেন? খোঁজ রেখেছে মন্ত্রণালয়? অথবা প্রটেকশনিস্ট-দুনিয়ায় তথাকথিত 'প্রতিযোগিতা' শেখাতে চাওয়া 'থিঙ্কট্যাংক'?

আরও পড়ুন: এলডিসি উত্তরণ: সময় বাড়ানোর আবেদনের পর যা করতে হবে (২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬); এলডিসি উত্তরণ: যে সত্য উচ্চারণ করা হয় না (৩০ জানুয়ারি ২০২৬)।

মান-মর্যাদার রেটোরিক ও চুক্তির ফাঁদ

চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। কিন্তু ২০০৫ সাল থেকে চীন 'ডেভেলপিং' হয়েই বসে আছে। আমেরিকার সঙ্গে 'ডেভেলপড' তালিকায় যাওয়ার জন্য সে লাফালাফি করেনি। পশ্চিমের তুলনায় মাথাপিছু আয় কম, গ্রাম ও শহরের বৈষম্য প্রকট—এসব অজুহাতে নাছোড়বান্দার মতো ডেভেলপিং হয়েই বসে আছে।

আমরা সিঙ্গাপুর হতে চাই, কিন্তু সিঙ্গাপুর কি 'ডেভেলপড' হতে চায়? নানা অজুহাতে দুবাই-সিঙ্গাপুরের মতো ধনী দেশগুলোও ভানুয়াতুর সঙ্গেই 'ডেভেলপিং' তালিকায় বসে আছে। যেটুকু বাণিজ্যসুবিধা পায়, ছাড়বে না।

অথচ গ্র্যাজুয়েশনের অন্তঃসারশূন্য মান-সম্মানের বাণী ছড়িয়ে, অপরিহার্য বাণিজ্যসুবিধা 'সারেন্ডার' করে, গার্মেন্টস বাঁচানোর নামে বিশ্বের ধনী পাঁচটি অর্থনীতির সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যচুক্তি করছে বাংলাদেশ! এগুলোর কোনোটাই সমান অংশীদারত্বের চুক্তি নয়, বরং বহু ক্ষেত্রেই বাধ্যতামূলক ক্রয়ের বন্দোবস্ত। তাড়াহুড়ার গ্র্যাজুয়েশন করে শেষ সুরক্ষাটুকুও হারাচ্ছে আমাদের ভঙ্গুর অর্থনীতি, আর এখন একের পর এক শিল্পোন্নত দেশের সঙ্গে চুক্তি করে দেশের অর্থনৈতিক পলিসি-স্পেসের পুরোটাই বিকিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা চলছে!

মাহা মির্জা গবেষক ও খণ্ডকালীন শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। মতামত লেখকের নিজস্ব।