মরিশাসের কাছ থেকে ভারত মহাসাগরের বিতর্কিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জ সরাসরি কিনে নেওয়ার একটি প্রস্তাব বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। দ্বীপপুঞ্জটির ওপর যুক্তরাজ্যের কর্তৃত্ব এড়িয়ে কীভাবে সরাসরি মরিশাস সরকারের সঙ্গে এই চুক্তি সম্পন্ন করা যায়, মার্কিন কর্মকর্তারা এখন সেই উপায় খুঁজছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানা গেছে। ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো চাগোস দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
দিয়েগো গার্সিয়ায় যৌথ সামরিক ঘাঁটি
বর্তমানে দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যৌথ সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ভারত মহাসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন অংশে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য এই ঘাঁটিটিকে অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে দুই দেশ।
কীভাবে মরিশাস থেকে আলাদা হয়েছিল চাগোস?
১৮১৪ সাল থেকে ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল হিসেবেও পরিচিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জ যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ১৯৬৫ সালে মরিশাস যখন ব্রিটিশ উপনিবেশ ছিল, তখন চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে মরিশাস থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। সে সময় যুক্তরাজ্য মাত্র ৩০ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময়ে দ্বীপগুলো কিনে নিয়েছিল। তবে মরিশাস পরবর্তীতে দাবি করে, এই বিচ্ছেদ মোটেও ন্যায্য ছিল না এবং ব্রিটিশদের প্রচণ্ড চাপের মুখে তারা এটি করতে বাধ্য হয়েছিল।
এরপর ১৯৬৭ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে সামরিক ঘাঁটি তৈরির পথ সুগম করতে দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দাদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে ব্রিটিশ সরকার। ১৯৬৮ সালে মরিশাস স্বাধীনতা লাভ করলেও চাগোস দ্বীপপুঞ্জকে আইনগতভাবে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করে আসছে। দেশটিকে স্বাধীনতা দেওয়ার আগেই অন্যায়ভাবে দ্বীপগুলো কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে যুক্তি মরিশাসের।
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্য দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ মরিশাসের কাছে হস্তান্তর করতে সম্মত হয়। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বেশ কয়েকজন বিশ্বনেতা সে সময় এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন।
দাসপ্রথার ইতিহাস ও চাগোসিয়ানদের উচ্ছেদ
ওলন্দাজ (ডাচ) ও ফরাসিরা নারকেল বাগানে কাজ করানোর জন্য আফ্রিকা এবং মাদাগাস্কার থেকে দাসদের এই দ্বীপে নিয়ে আসার পর বহু বছর ধরে চাগোস দ্বীপপুঞ্জে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল। এই দাস ও তাদের বংশধরেরা দীর্ঘ সময়ে নিজেদের একটি অনন্য সংস্কৃতি, ভাষা, খাবার ও সংগীতের ধারা তৈরি করেন। এই জনগোষ্ঠী মূলত ‘চাগোসিয়ান’ নামে পরিচিত।
১৯৭১ সালে দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে মার্কিন-যুক্তরাজ্য যৌথ সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার আগে, যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল দ্বীপটিকে যেন সম্পূর্ণ জনমানবহীন করা হয়। ব্রিটিশ কর্মকর্তারা মার্কিনদের এই দাবিতে সম্মত হন এবং দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দাদের অবমূল্যায়ন করে উপহাসের ছলে মাত্র কয়েকজন ‘টারজান অব ম্যান ফ্রাইডেজ’ বলে অভিহিত করেন।
এর পরপরই চাগোসিয়ানদের পুরো জনসংখ্যাকে দ্বীপ থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া হয়। জাহাজে করে তাদের মরিশাস ও সেশেলস দ্বীপে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। নির্বাসিত এই মানুষদের অনেকেই উপযুক্ত বাসস্থান, অর্থ কিংবা নাগরিক নথিপত্র পাননি, যার ফলে নতুন করে জীবন গড়তে তাদের চরম সংগ্রাম করতে হয়। এই অমানবিক উচ্ছেদের জন্য পরবর্তীতে অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চেয়েছিল যুক্তরাজ্য সরকার। বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দেওয়ার পর দ্বীপগুলো দীর্ঘ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে এবং তা অরণ্যে রূপ নেয়। ২০১০ সালে এই অঞ্চলটিকে সামুদ্রিক সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
যুক্তরাজ্য-মরিশাস চুক্তির আসল শর্ত কী?
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও মরিশাস একটি নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় সম্মত হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে অবস্থিত যৌথ সামরিক ঘাঁটিটি আগামী ৯৯ বছর পর্যন্ত পরিচালনা করবে যুক্তরাজ্য। এরপর যুক্তরাজ্য ও মরিশাস উভয়ে সম্মত হলে চুক্তির মেয়াদ আরও ৪০ বছর বাড়ানো যাবে। পরবর্তীতে দুই পক্ষের সম্মতিতে এই মেয়াদ আরও দীর্ঘ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
যদি ৯৯ বছর পর এই চুক্তি শেষও হয়ে যায় এবং মরিশাস যদি ঘাঁটিটি অন্য কোনও দেশকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তবুও পরবর্তী ৪০ বছরের জন্য ঘাঁটিটি ব্যবহারের প্রথম অধিকার যুক্তরাজ্যেরই থাকবে। মরিশাস চাইলেই এককভাবে এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে না। যুক্তরাজ্য যদি চুক্তির পাওনা টাকা পরিশোধ না করে কিংবা মরিশাসের ওপর আক্রমণ চালায়, কেবল তখনই মরিশাস চুক্তি বাতিলের সুযোগ পাবে।
দিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহারের জন্য মরিশাসকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেবে যুক্তরাজ্য। ৯৯ বছরে এই পেমেন্টের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩৪০ কোটি (৩.৪ বিলিয়ন) ব্রিটিশ পাউন্ড। এ ছাড়া চুক্তিতে চাগোসিয়ান জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরণের অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাদের জন্য একটি ট্রাস্ট ফান্ডে ৪০ মিলিয়ন (৪ কোটি) ব্রিটিশ পাউন্ড জমা দেবে যুক্তরাজ্য। তবে এই চুক্তিতে চাগোসিয়ানরা আবারও নিজেদের দ্বীপে ফিরে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনও নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র সমালোচনার পর গত এপ্রিল মাসে মরিশাসের কাছে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের এই পুরো পরিকল্পনাটি স্থগিত করে দেয় যুক্তরাজ্য সরকার।



