ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি: ট্রাম্পের কূটনীতি ও বিশ্ববাজারে প্রভাব
ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি: ট্রাম্পের কূটনীতি ও বাজার

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ আহ্বানের পর ইরান ও ইসরায়েল একে অপরের ওপর পাল্টা সামরিক আক্রমণ সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে তেহরান স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছে যে, লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসন অব্যাহত থাকলে তারা পুনরায় সামরিক যুদ্ধ শুরু করবে।

বিশ্ববাজারে তেল ও ডলারের দামে প্রভাব

এই পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরের পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও ইরানের সামরিক বাহিনী প্রথম দফার হামলা শেষের ঘোষণা দিলে তা আবার কমে যায়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে মার্কিন ডলারের বিনিময় মূল্য গত দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা নিচে নেমে আসে।

ইসরায়েলের যুদ্ধবিরতি সিদ্ধান্ত

ইসরায়েলি প্রশাসনের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, তেহরানের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের পর তেল আবিবও ইরানের ওপর নতুন করে হামলা না চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে বৈরুতের উপকণ্ঠে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর ওপর ইসরায়েলি হামলার প্রতিশোধ হিসেবে গত রোববার রাতে ইসরায়েলের মূল ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে তেহরান। জবাবে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির একটি পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় নিখুঁত হামলা চালায়।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পাল্টা হামলা ও হতাহতের তথ্য

এর পর পরই ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস ইসরায়েলের হাইফা শহরের একটি সমমানের শিল্প কারখানায় পাল্টা আঘাত হানে, যদিও এই ঘটনায় কোনো পক্ষেই নিহতের খবর পাওয়া যায়নি। এই তীব্র উত্তেজনা ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ অবসানের চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে মারাত্মক জটিল করে তুলেছে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

যুদ্ধের পটভূমি ও ট্রাম্পের ভূমিকা

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধটি গত ৮ এপ্রিল ঘোষিত একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে কিছুটা শান্ত হলেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মাঝেমধ্যেই সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে। ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, উভয় পক্ষই এখন একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায় এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত আলোচনা চলছে।

এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, ইরান বা হিজবুল্লাহর সঙ্গে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু করলে ইসরায়েলকে হয়তো একাই লড়াই করতে হতে পারে। তবে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পের চাপের বিষয়টি অস্বীকার করে একে দুই নেতার দীর্ঘ বন্ধুত্বের মধ্যকার একটি সাময়িক উত্তপ্ত আলোচনা বলে অভিহিত করেছেন।

ইরানের অবস্থান ও হুমকি

অন্য দিকে ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তেহরানও একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য প্রস্তুত এবং প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থে আঘাত হানতে পারে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস তার মুখপাত্র ফারহান হকের মাধ্যমে এক বিবৃতিতে এই অঞ্চলের পরিস্থিতি শান্ত রাখতে সব পক্ষকে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন যে, চরম সন্দেহজনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের বার্তা বিনিময় চলছে। ইরানের সংসদীয় কমিটির প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বা ইয়েমেনের হুথিদের মতো মিত্রদের ওপর যেকোনো আঘাতের চড়া মূল্য দিতে হবে।

হুথিদের সম্পৃক্ততা ও হরমুজ প্রণালী

ইতিমধ্যেই লোহিত সাগরে ইসরায়েলি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধের ঘোষণা দিয়ে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলের ইলাত এলাকা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা ইসরায়েলি বাহিনী আকাশেই ধ্বংস করে দেয়। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকায় লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার নিয়ন্ত্রণকারী হুথিদের এই যুদ্ধ সম্পৃক্ততা আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহে নতুন সংকট তৈরি করতে পারে।

তেহরানের আকাশপথ ও বিমানবন্দর

এদিকে তেহরানের আকাশেও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একটি ড্রোন ভূপাতিত করার পর ইমাম খোমেনী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক হয়েছে। ইসরায়েলি প্রশাসন অবশ্য জানিয়েছে যে, লেবাননে তাদের হিজবুল্লাহ বিরোধী অভিযান আমেরিকার সঙ্গে ইরানের শান্তি আলোচনার বাইরে থাকবে এবং সেখানে হামলা অব্যাহত থাকবে।

লেবানন ও শান্তি আলোচনার শর্ত

অন্য দিকে তেহরানের দাবি, লেবাননে সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি না হলে আমেরিকার সঙ্গে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়। লেবাননে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ঈসা সোমবার জানিয়েছেন যে, ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যকার স্থগিত আলোচনা পুনরায় শুরু হতে যাচ্ছে।

শান্তি চুক্তির শর্ত ও বর্তমান পরিস্থিতি

বর্তমানে হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল চলাচল বন্ধ রেখেছে তেহরান এবং আমেরিকাও ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নিজস্ব নিষেধাজ্ঞা জারি রেখেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যেকোনো শান্তি চুক্তির প্রধান শর্ত হবে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্পূর্ণ বন্ধ করা। এর বিপরীতে ইরানের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, তাদের অবরুদ্ধ বিলিয়ন ডলার তহবিল মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের পূর্ণ কর্তৃত্বের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

সূত্র: রয়টার্স